অন্য দেশের মডেল নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়

0 25

অন্য দেশের মডেল নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়,বলেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। কারণ আমাদের শিক্ষার স্বকীয়তা আছে। নিজস্ব একটি সভ্যতা আছে। আমাদের সভ্যতায় বিশাল একটি অংশ জুড়ে আছে শিক্ষা।

বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) দুপুরে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের উদ্যোগে আয়োজিত ‘শিক্ষায় মডেল রাষ্ট্রের সন্ধানে: প্রসঙ্গ জার্মানি’ ওয়েবিনারে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ আরও বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য কিছু দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। শতভাগ স্বাক্ষরতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষায় বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বছরে ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এ বিপুল পরিমান বাজেট প্রয়োগ করে বিশ্বখ্যাত গবেষক-অধ্যাপকদের আকর্ষণ করা সহজ। বাংলাদেশ শিক্ষায় জিডিপির মাত্রা ১ দশমিক ৩ শতাংশ খরচ করা হয় উল্লেখ করে ইমতিয়াজ আহমেদ আরও বলেন, এতো অপ্রতুল বরাদ্দ দিয়ে বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেষণা সম্ভব না। তিনি আলোচনায় মানবিক শিক্ষা, বাংলাদেশের সুপ্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অর্জনের কথা তুলে ধরেন।
সারাদেশে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত করতে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন অধ্যাপক ইমতিয়াজ। তিনি বলেন, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রায় অর্ধকোটি সদস্য রয়েছেন। তাদের ‘লিটারেসি এম্বাসেডর’ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত করা যায়। এক্ষেত্রে ভিডিপি সদস্যদের প্রত্যেককে ট্যাব সরবরাহ করা যেতে পারে। তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে সেগুলোর মাধ্যমে সাক্ষর করে গড়ে তুলতে পারেন।

বাঙালি সভ্যতায় শিক্ষার প্রাচুর্যর কথা উল্লেখ করে ড. ইমতিয়াজ নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ও কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যকার একটি বিতর্কের ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে তাদের মধ্যে একটি বিতর্ক হয়েছিল। এ বিতর্কের বিষয় ছিল, মানুষ না থাকলে কোন কিছুর সৌন্দর্য থাকবে কিনা। এ বিষয়ে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ভাবছিলেন তখন কবিগুরু উত্তর দিয়েছিলেন, সৌন্দর্য উপভোগের জন্য মানুষ না থাকলে সৌন্দর্য থাকবে না। এ উত্তর শুনে আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, কখনো কখনো আমার নিজেকে তোমাদের থেকে বেশি ধার্মিক মনে হয়। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু মানুষকে প্রাধান্য দেয়ার এ তত্ত্ব বাউলদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, মহামারি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। তবে, মহামারি পুরো পৃথিবীকে আরও অনেক কাছে নিয়ে এসেছে। এখন আমরা অনলাইনে অনেক কাছাকাছি চলে এসেছি। আমার অনেক ছাত্র কানাডায় ভর্তি হয়েও যেতে পারছেন না, তারা কিন্তু অনলাইনে ক্লাস করতে পারছেন। সারা পৃথিবীকে কিন্তু ছোট্ট একটি জায়গায় নিয়ে আসা সম্ভব এর মাধ্যমে। সে সক্ষমতাকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে।

অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ আরও বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যে গবেষণায় নেতৃত্ব দিতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ জার্মানি।

স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা গঠিত উন্মুক্ত মঞ্চ ও এডুকেশন একাডেমি আয়োজিত ধারাবাহিক আয়োজনের দ্বিতীয় ওয়েবিনার ‘শিক্ষায় মডেল রাষ্ট্রের সন্ধানে: প্রসঙ্গ জার্মানি’ শিরোনামে ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য কাজিম উদ্দীন আহম্মেদ ধনু।

ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জার্মানির বন ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পরিচালক ও গবেষক ড. মারুফ মল্লিক। ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ড. কাজী জাকির হোসেন।
প্রবন্ধ উপস্থাপক তার উপস্থাপনায় জার্মানির শিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, সেখানে পাঁচ স্তরের শিক্ষা কাঠামো বিদ্যমান। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার পূর্বে বাচ্চাদের প্রি-স্কুলিং শিক্ষা প্রদান করা হয়। ছয় বছরের কম বয়সী বাচ্চারাই মূলত প্রি-স্কুলিং এর আওতায় আছে। প্রবন্ধে বলা হয়, জার্মানিতে প্রি-স্কুলিং থেকে প্রাথমিক শিক্ষা হয়ে সেকেন্ডারি এডুকেশন পর্যন্ত স্তরসমূহে কোনো পাবলিক পরীক্ষা নেই। শিক্ষকরাই ক্লাস অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করে থাকেন। জার্মান শিক্ষা ব্যবস্থার বিশেষ দিক তুলে ধরতে গিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপক বলেন, সেখানে সরকারি বেসরকারি স্কুল ভেদে পাঠক্রমের কোনো তারতম্য হয় না। সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে পাঠক্রম অনুমোদন করে থাকে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তাই পড়াতে হয়। কেউ যেমন পাঠক্রমের অতিরিক্ত কিছু পড়াতে পারে না আবার কেউ পাঠক্রমের কোনো অংশ বাদ দিতে পারে না। সাধারণ শিক্ষায় যারা ভাল করতে ব্যর্থ হয় জার্মান শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের জন্য কারিগরি শিক্ষা নিশ্চিত করে থাকে। প্রবন্ধ উপস্থাপক জার্মান শিক্ষা প্রশাসন ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি তুলে ধরে বলেন, জার্মানিতে ক্যাডার সার্ভিস বলে কিছু নেই। সেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা যেকোনো মন্ত্রণালয়ের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞদের নিয়োগ প্রদান করে থাকে। তাছাড়া, জার্মান সরকার শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যয় করে থাকে। একজন শিক্ষার্থীর প্রাথমিক শিক্ষা থেকে টারশিয়ারি শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার গড় হিসাবে ১৩ হাজার ৫২৯ ডলার খরচ করে থাকে। জার্মানিতে প্রাথমিক শিক্ষায় ১২ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ২ জন শিক্ষক এবং সেকেন্ডারিতে ১২ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ জন শিক্ষক আছেন। প্রবন্ধ উপস্থাপক আরও উল্লেখ করেন, এ পর্যন্ত জার্মানি থেকে ৮০ জন বিজ্ঞানী, গবেষক নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন, যা জার্মান শিক্ষা ব্যবস্থারই ফল।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ময়মনসিংহ-১১ আসনের সংসদ সদস্য কাজিম উদ্দীন আহম্মেদ ধনু শিক্ষা ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের অর্জনসমূহ তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে বই উপহার, উপবৃত্তি, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন বর্তমান সরকারের অনন্য উদ্যোগ। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। তিনি করোনাকালে অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখায় শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানান।সূত্রঃ অনলাইন

 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments
Loading...