বাস্তুসংস্থান , প্রকারভেদ, একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থান, খাদ্য শৃংখল, খাদ্যজাল ও পার্থক্য

2
1579
বাস্তুসংস্থান

বাস্তুসংস্থান , প্রকারভেদ, একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থান, খাদ্য শৃংখল, খাদ্যজাল ও পার্থক্য

বাস্তুসংস্থান (Ecosystem)

বেঁচে থাকার সব রকম  উপাদান আমরা পরিবেশ থেকে পাই। পরিবেশকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- জড় পরিবেশ ও জীব পরিবেশ। জীব ও জড় পরিবেশের সম্বন্ধ নিবিড়। প্রকৃতির জড় ও জীব উপাদানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলেই পরিবেশে ভারসাম্য বিরাজ করছে। কোনো জিনিসই একেবারে ফুরিয়ে যাচ্ছে না। প্রকৃতির বিভিন্ন প্রাকৃতিক চক্রের কাজের ফলেই এটা সম্ভব হচ্ছে। জড় পরিবেশের মূল উপাদান হচ্ছে মাটি, পানি, বায়ু, আলো ও তাপ। এ উপাদানগুলো জীবের আহার ও আশ্রয় যুগিয়ে থাকে। জীবের বেঁচে থাকার জন্য কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় জীব ও জড়ের মধ্যে গড়ে ওঠে নানা রকম সম্পর্ক। কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার পরিবেশে জীব ও জড় উপাদান এবং তাদের সম্পর্ক ও পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার গতিময় পদ্ধতিকে বাস্তুসংস্থান বা ইকোসিস্টেম (Ecosystem) বলে।

পরিবেশ অনুসারে বাস্তুসংস্থান প্রধানত দুই রকম। যথাজলজ বাস্তুসংস্থান এবং স্থলজ বাস্তুসংস্থান।

জলজ বাস্তুসংস্থানের মধ্যে পুকুরের বাস্তুসংস্থান, হ্রদের বাস্তুসংস্থান ইত্যাদি হলো মিঠা পানির বাস্তুসংস্থান। সাগর, মহাসাগর এগুলো হলো লবণাক্ত পানির বাস্তুসংস্থান।

স্থলের বাস্তুসংস্থানের উদাহরণ তৃণভূমির বাস্তুসংস্থান, মরুভূমির বাস্তুসংস্থান, অরণ্যের বাস্তুসংস্থান ইত্যাদি।

 

একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থান বা ইকোসিস্টেম

জলজ বাস্তুসংস্থানের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো পুকুর। কারণ পুকুরে বসবাসকারী অজীব ও সজীব উপাদানের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ করা যায় এবং ভালোভাবে বোঝা যায়। নিম্মে একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থান বর্ণনা করা হলো:

১। জড় উপাদান: জড় উপাদানের মধ্যে রয়েছে মাটি, পানি, খনিজ লবণ,  অক্সিজেন,  নাইট্রোজেন  ও কার্বন-ডাই    অক্সাইড। একটি পুকুরের বাস্তুসংস্থানের  কার্যকারিতা  এসব জড় উপাদানকে জীব উপাদান কেমন করে ব্যবহার করছে তার উপর নির্ভর করে।

২। সজীব উপাদান: বাস্তুসংস্থানের সজীব উপাদানকে তিন ভাগে ভাগ করা  হয়- উৎপাদক,  খাদক  ও বিয়োজক। নিচে এদের সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-

ক) উৎপাদক : পুকুরের পানিতে ভাসমান ও কিনারায় অগভীর পানিতে জন্মে থাকা সবুজ উদ্ভিদ (যেমন- শেওলা, কচুরিপানা, ক্ষুদিপানা, টোপাপনা ও পানিমরিচ) পুকুরে বাস্তুসংস্থানের উৎপাদক। পানিতে ভাসমান খুদে জীবদের প্লাংকটন বলে। ভাসমান ক্ষুদ্র প্রাণীদের জুয়োপাংকটন বলে। আর সবুজ প্লাংকটন জাতীয় খুদে উদ্ভিদকে বলে ফাইটোপ্লাংকটন (Phytoplankton)। সবুজ জলজ শেওলা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ সালোক-সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় নিজের খাদ্য প্রস্তুত করে বেঁচে থাকতে পারে, তাই এদের উৎপাদক বলে।

উৎপাদক

 

খ) খাদক: জলজ কীটপতঙ্গ, লার্ভা, মাছ, শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙ, বক, গাংচিল, মাছরাঙা ইত্যাদি খাদক পর্যায়ভুক্ত। খাদক স্তরকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যথা-

প্রথম  স্তরের  খাদক: উদ্ভিদভোজী  বিভিন্ন প্রকার  ভাসমান  খুদে পোকা, মশার শূককীট, আণুবীক্ষণিক  প্রাণী জুয়োপ্লাংকটন  প্রভৃতি প্রথম  স্তরের  খাদক। ভাসমান ক্ষুদ্র প্রাণীদের  জুয়োপ্লাংকটন বা জু-প্লাংকটন (zooplankton)  বলে।

প্রথম স্তরের খাদক

এ খাদকগুলো নিজের খাদ্য প্রস্তুত করতে পারে না এবং সরাসরি উৎপাদককে ভক্ষণ করে বেঁচে থাকে।

 

 

দ্বিতীয় স্তরের খাদক: ছোট ছোট মাছ, চিংড়ি, ব্যাঙ, কিছু জলজ প্রাণী দ্বিতীয় স্তরের খাদক। এরা নিজেরা খাদ্য প্রস্তুত করতে পারে না এবং উৎপাদককেও খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে না। এরা প্রথম স্তরের খাদকদের খেয়ে বেঁচে থাকে।

তৃতীয় স্তরের খাদক: যেসব প্রাণী দ্বিতীয় স্তরের খাদক খেয়ে বেঁচে থাকে তারাই তৃতীয় স্তরের খাদক। যেমন- শোল, বোয়াল, চিতল, গজার, ভেটকি প্রভৃতি বড় মাছ, বক, চিল, উদবিড়াল, বাজপাখি, ঈগল ইত্যাদি।

 

গ) বিয়োজক: পুকুরে বসবাসকারী ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া এবং অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীব বিয়োজকরূপে  কাজ করে। এরা জীবিত অথবা মৃত প্রাণীদের আক্রমণ করে ও পচনে সাহায্যে করে, ফলে উৎপাদকের ব্যবহার উপযোগী জৈব ও অজৈব রাসায়নিক পদার্থ পুনরায় সৃষ্টি হয়। এসব বিয়োজিত জৈব ও অজৈব পদার্থ  উৎপাদকেরা  ব্যবহার  করে  থাকে।

প্রবাহচিত্রের  মাধ্যমে  একটি  পুকুরের  বাস্তুসংস্থানের উপাদানগুলো দেখানো হলো।

 

প্রবাহ চিত্র

 

 

 

 

খাদ্যশৃঙ্খল খাদ্যজাল

আমরা একটু আগেই দেখলাম পুকুরের বাস্তুসংস্থানে খাদ্যের জন্য একে অন্যের উপরে নির্ভর করে। সকল খাদ্য ও শক্তির উৎস সূর্য। সবুজ উদ্ভিদ সূর্যের শক্তিকে খাদ্যে সঞ্চয় করে। এ পৃথিবীতে প্রাণীরা খাদ্যের জন্য উদ্ভিদ বা ছোট প্রাণীর উপর নির্ভরশীল। ধরুন, আপনি আজ সকালে ডিম খেয়েছেন। ডিমটি এসেছে মুরগি থেকে। মুরগি শস্যদানা খেয়ে বেড়ে উঠেছে এবং ডিম পেড়েছে। শস্যদানা তৈরি হয়েছে উদ্ভিদে সূর্যের আলোকে ব্যবহার করে। এক্ষেত্রে আমরা একটি সরল সম্পর্ক পেলাম।

উদ্ভিদ-মুরগি-মানুষ। এটি একটি খাদ্যশৃঙ্খল।

ঘাস→ঘাসফড়িং→ব্যাঙ→সাপ → ইগল

সবসময় খাদ্যে নির্ভরশীলতার এরকম সরল সম্পর্ক থাকে না। বিভিন্ন সম্পর্ক অর্থাৎ খাদ্যশৃঙ্খল পরস্পর যুক্ত হয়ে জটিল সম্পর্কে পরিণত হয়। একে খাদ্যজাল বলে। যেমন-উপরের উদাহরণটির ক্ষেত্রেই একটি ঘাসফড়িং উদ্ভিদের পাতা খেতে পারে। মুরগি ঘাসফড়িংটি খেতে পারে। আবার মানুষ ডিম না খেয়ে শস্যদানা খেতে পারে। এভাবে  কয়েকটি খাদ্যশৃঙ্খল সমন্বয়ে একটি খাদ্যজাল পাওয়া যায়।

খাদ্য শৃংখল:

সকল প্রাণীই শক্তির জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। উদ্ভিদ সূর্যের আলো ব্যবহার করে নিজের খাদ্য নিজেরাই তৈরি করে। পোকামাকড় উদ্ভিদ খেয়ে বেঁচে থাকে আবার ব্যাঙ পোকামাকড়কে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। একইভাবে সাপ ব্যাঙ খায় এবং ঈগল সাপ খায়। এভাবেই শক্তি উদ্ভিদ থেকে প্রাণীতে প্রবাহিত হয়। বাস্তুসংস্থানে উদ্ভিদ থেকে প্রাণীতে এই শক্তি প্রবাহের ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই হল খাদ্য শৃঙ্খল।  সবুজ উদ্ভিদ থেকেই প্রতিটি খাদ্য শৃঙ্খলের শুরু।

সহজ কথায় আমরা বলতে পারি,

খাদ্য শক্তি উৎপাদক থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের খাদকের মধ্যে প্রবাহিত

হলে সেই প্রবাহকে একসাথে খাদ্য শিকল বা খাদ্য শৃংখল বলে। যেমন-

উৎপাদক →প্রথম স্তরের খাদক→ দ্বিতীয় স্তরের খাদক →তৃতীয় স্তরের খাদক→ সর্বোচ্চ স্তরের খাদক

 

খাদ্যজাল:

যেকোনো বাস্তুসংস্থানে অনেকগুলো খাদ্যশৃঙ্খল থাকে। বাস্তুসংস্থানের সকল উদ্ভিদ ও প্রাণী কোন না কোন খাদ্য শৃঙ্খলের অন্তর্ভুক্ত। একাধিক খাদ্যশৃঙ্খল একত্রিত হয়ে খাদ্যজাল তৈরি করে।

বাস্তুতন্ত্রে বেশ কয়েকটি খাদ্য শিকল একত্রিত হয়ে যে জালের মত গঠন তৈরি করে তাকে খাদ্যজাল বলে । বাস্তুতন্ত্রের খাদ্য শিকলে একই খাদক বিভিন্ন স্তরে স্থান পেতে পারে। আর এ কারণেই এই সকল খাদ্য শিকল গুলো একত্রে  দেখতে জালের মতো মনে হয়। যেমন-  উপরের খাদ্যজাল এ মোট পাঁচটি খাদ্য শিকল পাওয়া যায়। যথা- ১. শৈবাল → ছোট মাছ → বাজপাখি ২. শৈবাল → জুপ্লাংকটন →বড় মাছ →বাজপাখি ৩. শৈবাল → ছোট মাছ →বড় মাছ →বাজপাখি ৪. শৈবাল →জুপ্লাংকটন →ছোট মাছ →বাজপাখি

৫. শৈবাল →জু প্লাংটন →ছোট মাছ →বড় মাছ →বাজপাখি

 

খাদ্য খাদ্যজালের মধ্যে ৫টি পার্থক্য নিচে দেওয়া হলো

খাদ্যশৃঙ্খল :

. সূর্যশক্তি খাদ্যের মাধ্যমে এক জীব হতে অপর জীবে স্থানান্তরের ফলে যে শৃঙ্খল গঠিত হয় তাকে খাদ্যশৃঙ্খল বলে। অর্থাৎ উদ্ভিদ থেকে প্রাণীতে শক্তি প্রবাহের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হলো খাদ্য শৃংখল।

. বিভিন্ন উদ্ভিদ প্রাণীর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে প্রকাশ করে।

. একটি পরিবেশে কয়েকটি খাদ্যশৃঙ্খল থাকতে পারে।

. সবুজ উদ্ভিদ থেকেই প্রতিটি খাদ্যশৃঙ্খলের শুরু।

. এখানে খাদক উৎপাদক, বিয়োজক একসঙ্গে নাও থাকতে পারে।

৬.  খাদ্যশৃঙ্খলে দুই বা ততোধিক প্রজাতির খাদক থাকে।

 

খাদ্যজাল :

১. পরিবেশে বিদ্যমান খাদ্যশৃঙ্খলগুলো একটি অপরটিসাথে যুক্ত হয়ে খাদ্যজাল তৈরি করে। অর্থাৎ একাধিক খাদ্য শৃংখলের সমন্বয়ে তৈরি হয় খাদ্যজাল।

২. বিভিন্ন খাদ্যশৃঙ্খলের মধ্যে সম্পর্ক প্রকাশ করে।

৩. একটি পরিবেশে একটি খাদ্যজাল থাকে।

৪. খাদ্যজালের শুরুর উপাদানটি নির্দিষ্ট নয়।

৫. এখানে খাদক, উৎপাদক, বিয়োজক এক সঙ্গে থাকে।

৬.  একটি খাদ্যজালে দুই বা ততোধিক খাদ্যশৃঙ্খল থাকে।

 

Extra

 

যে খাদ্য শিকল এর প্রথম স্তরের খাদক আকারে সবচেয়ে ছোট থাকে এবং

পর্যায়ক্রমে উপরের খাদকেরা নিচের স্তরের খাদক গুলো শিকার করে খায়,

সেই খাদ্য শিকল কে শিকারজীবি খাদ্য শিকল বলে। যেমন-

শৈবাল → জুপ্লাংকটন → ছোট মাছ → বড় মাছ → বাজপাখি পানিতে ভাসমান ক্ষুদ্র জীবদের বলা হয় প্লাংকটন, পানিতে ভাসমান ক্ষুদ্র উদ্ভিদ (সালোকসংশ্লেষণকারী) কে ফাইটোপ্লাংটন বলে। পানিতে ভাসমান ক্ষুদ্র প্রাণী যারা ফাইটোপ্লাংটন, ফাইটোপ্লাংটনকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে তাদেরকে জুপ্লাংকটন বা প্রাণী প্লাংটন বলে।

 

 

2 COMMENTS

  1. If you are going for finest contents like myself, only visit
    this website all the time for thee reason that it provides feature contents, thanks

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here