Take a fresh look at your lifestyle.

শিখন শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

0 68

কখনো কি ভেবে দেখেছেন, স্কুলের সবচেয়ে বোরিং ক্লাসটা কেন এত বোরিং লাগতো? আবার অন্যদিকে, কোনো কোনো স্যারের ক্লাসের জন্য আমরা সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করতাম? পার্থক্যটা কিন্তু বিষয়ে ছিল না, ছিল পড়ানোর ধরনে। সেই যে চক-ডাস্টার আর টানা লেকচারের দিন, সেগুলো এখন অতীত। যুগ বদলেছে, আর তার সাথে বদলে গেছে শিখন-শেখানো পদ্ধতি ও কৌশল

আজকের দিনে শিক্ষাদান মানে শুধু তথ্য দেওয়া নয়, বরং ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা, তাদের চিন্তার জগৎকে উসকে দেওয়া। শিখন শেখানো কার্যক্রম এখন একটা দ্বিমুখী রাস্তার মতো, যেখানে শিক্ষক এবং ছাত্র দুজনেই সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।

তাহলে চলুন, আর ভূমিকা না বাড়িয়ে ডুব দেওয়া যাক আধুনিক শিক্ষাদানের সেই জাদুকরী জগতে, যেখানে শেখাটা একটা উত্তেজনামূলক অভিযানে পরিণত হয়। আমি এখানে এমন ৭টি পদ্ধতি নিয়ে কথা বলব যা আপনার ভাবনার দরজায় নতুন কড়া নাড়বে।

 

১. অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি (Participatory Method)

 

পুরোনো দিনের মতো শিক্ষক শুধু বলে যাবেন আর ছাত্র-ছাত্রীরা চুপচাপ শুনে যাবে—এই ধারণা এখন অচল। অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি হলো এমন একটি কৌশল যেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেরাই আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।

ভাবুন তো, ক্লাসে ইতিহাসের কোনো ঘটনা নিয়ে আলোচনার সময় যদি আপনাকে বলা হয় আপনার মতামত দিতে, বা কোনো চরিত্র নিয়ে বিতর্ক করতে, তাহলে কি আপনার আগ্রহ বাড়বে না? ঠিক তাই!

  • এটা কীভাবে কাজ করে? শিক্ষক এখানে একজন বক্তা নন, বরং একজন সহায়তাকারী বা মডারেটর। তিনি প্রশ্ন করেন, আলোচনার সুযোগ তৈরি করেন এবং সবাইকে কথা বলতে উৎসাহিত করেন।
  • কেন এটা কার্যকর? এই পদ্ধতিতে ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের মূল্যবান মনে করে। তাদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা (Critical Thinking) এবং কথা বলার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। ক্লাসটা তখন আর একঘেয়ে মনে হয় না।

 

২. প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিখন (Project-Based Learning – PBL)

 

“আমাকে বলো, আমি ভুলে যাব। আমাকে দেখাও, আমার মনে থাকবে। আমাকে করতে দাও, আমি শিখে যাব।” — বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের এই কথাটা প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিখনের মূলমন্ত্র।

বইয়ের পাতায় দূষণ সম্পর্কে পড়ার চেয়ে, নিজের এলাকার পানি দূষণের কারণ খুঁজে বের করে তার সমাধানের একটি মডেল তৈরি করা কি বেশি উত্তেজনার নয়? এটাই হলো প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিখন। এখানে ছাত্র-ছাত্রীরা একটি বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করে এবং একটি নির্দিষ্ট প্রজেক্টের মাধ্যমে তার সমাধান উপস্থাপন করে।

উদাহরণ:

  • বিজ্ঞান ক্লাসে একটি ছোট সোলার ওভেন তৈরি করা।
  • ইতিহাস ক্লাসে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি বানানো।
  • ভূগোল ক্লাসে নিজেদের এলাকার একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা।

এই পদ্ধতিতে দলবদ্ধভাবে কাজ করার মানসিকতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সৃজনশীলতা বহুগুণে বেড়ে যায়।

 

৩. গেম-ভিত্তিক শিখন (Game-Based Learning)

 

আমরা সবাই গেম খেলতে ভালোবাসি, তাই না? যদি পড়াশোনাটাও একটা গেমের মতো হতো, তাহলে কেমন হতো? গেম-ভিত্তিক শিখন বা গ্যামিফিকেশন (Gamification) ঠিক এই কাজটাই করে।

এখানে পড়াশোনার বিভিন্ন ধাপে পয়েন্ট, ব্যাজ, লিডারবোর্ড বা লেভেল আপের মতো গেমের উপাদান যোগ করা হয়। যেমন, কুইজে ভালো করলে পয়েন্ট পাওয়া, নতুন কিছু শিখলে একটা ভার্চুয়াল ব্যাজ পাওয়া ইত্যাদি।

  • কেন এটা এত জনপ্রিয়? কারণ এটি শেখার প্রক্রিয়াকে মজাদার করে তোলে এবং ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একটা স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি করে। Kahoot!-এর মতো অ্যাপগুলো এখন ক্লাসরুমে কুইজের জন্য খুবই জনপ্রিয়।

 

৪. সমস্যা-ভিত্তিক শিখন (Problem-Based Learning)

 

এই পদ্ধতিটা অনেকটা প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিখনের মতোই, কিন্তু এখানে শুরুটা হয় একটা জটিল ও বাস্তবসম্মত সমস্যা দিয়ে। ছাত্র-ছাত্রীদের কাজ হলো সেই সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করা এবং সম্ভাব্য সমাধান বের করা।

ধরুন, জীববিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষক একটি কাল্পনিক রোগীর কিছু লক্ষণ বলে দিলেন। এবার ছাত্র-ছাত্রীদের কাজ হলো গোয়েন্দার মতো অনুসন্ধান করে রোগটা কী হতে পারে এবং তার চিকিৎসা কী হবে, তা খুঁজে বের করা।

এই পদ্ধতিতে তাদের বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা এবং স্ব-নির্ভর হয়ে জ্ঞান অর্জনের তাগিদ তৈরি হয়।

 

৫. সহযোগিতামূলক শিখন (Collaborative Learning)

 

“দুই মাথা এক মাথার চেয়ে ভালো”—এই প্রবাদটা আমরা সবাই জানি। সহযোগিতামূলক শিখন এই ধারণার ওপরই ভিত্তি করে তৈরি। এখানে ছাত্র-ছাত্রীদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে দেওয়া হয় এবং তারা একসঙ্গে মিলে কোনো একটি টাস্ক সম্পন্ন করে।

এই পদ্ধতিতে তারা কেবল একে অপরের কাছ থেকে শিখতেই পারে না, বরং তাদের মধ্যে যোগাযোগ, সমঝোতা এবং টিমওয়ার্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দক্ষতাও তৈরি হয়। ‘Think-Pair-Share’ বা ‘Jigsaw’ এর মতো কৌশলগুলো এই পদ্ধতির দারুণ উদাহরণ।

 

৬. জিজ্ঞাসা-ভিত্তিক শিখন (Inquiry-Based Learning)

 

বাচ্চারা স্বভাবতই কৌতূহলী হয়। তারা সব সময় জানতে চায়, “এটা কেন হয়?”, “ওটা কীভাবে কাজ করে?”। জিজ্ঞাসা-ভিত্তিক শিখন ছাত্র-ছাত্রীদের এই স্বাভাবিক কৌতূহলকে ব্যবহার করে।

এখানে শিক্ষক সরাসরি উত্তর বলে দেন না। বরং তিনি এমন পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেরাই প্রশ্ন করে এবং সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে। শিক্ষক শুধু তাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেন।

উদাহরণস্বরূপ, “গাছ কীভাবে খাবার তৈরি করে?”—এটা সরাসরি না বলে, শিক্ষক জিজ্ঞেস করতে পারেন, “আচ্ছা, ভাবো তো, গাছের তো আমাদের মতো মুখ নেই, তাহলে ও খায় কী করে?”। এই একটা প্রশ্নই তাদের চিন্তার জগতে ঝড় তুলে দেবে।

 

৭. প্রযুক্তি-সমন্বিত শিখন (Technology-Integrated Learning)

 

আজকের যুগে প্রযুক্তি ছাড়া আমরা এক মুহূর্তও চলতে পারি না। তাহলে পড়াশোনাই বা পিছিয়ে থাকবে কেন? আধুনিক শিখন পদ্ধতি মানেই প্রযুক্তির স্মার্ট ব্যবহার।

ইন্টারঅ্যাক্টিভ হোয়াইটবোর্ড, শিক্ষামূলক ভিডিও, অনলাইন সিমুলেশন, পডকাস্ট, এবং বিভিন্ন এডুকেশনাল অ্যাপ ব্যবহার করে পড়াশোনাকে আরও আকর্ষণীয় এবং কার্যকর করে তোলা যায়। এর মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীরা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের জ্ঞান মুহূর্তের মধ্যে পেয়ে যায় এবং জটিল বিষয়গুলোও সহজে বুঝতে পারে।

 

প্রচলিত বনাম আধুনিক পদ্ধতির এক ঝলক

 

আসুন, একটি টেবিলের মাধ্যমে প্রচলিত এবং আধুনিক শিখন-শেখানো পদ্ধতির মূল পার্থক্যগুলো দেখে নিই।

বৈশিষ্ট্য (Feature) প্রচলিত পদ্ধতি (Traditional Method) আধুনিক পদ্ধতি (Modern Method)
শিক্ষকের ভূমিকা নির্দেশক (Instructor) সহায়তাকারী/গাইড (Facilitator/Guide)
ছাত্রের ভূমিকা নিষ্ক্রিয় শ্রোতা (Passive Listener) সক্রিয় অংশগ্রহণকারী (Active Participant)
মূল ফোকাস তথ্য মুখস্থ করা (Memorization) বোঝা ও প্রয়োগ (Understanding & Application)
মূল্যায়ন পরীক্ষা-ভিত্তিক (Mainly Exam-based) ধারাবাহিক ও বহুমুখী (Continuous & Diverse)
উপকরণ মূলত পাঠ্যপুস্তক (Textbook-centric) মাল্টিমিডিয়া, ইন্টারনেট, বাস্তব উপকরণ

 

শেষ কথা

 

তাহলে, শিখন শেখানোর সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি কোনটি? সত্যি বলতে, কোনো একটি পদ্ধতিকে সেরা বলা কঠিন। সেরা পদ্ধতি নির্ভর করে ছাত্র-ছাত্রীর বয়স, বিষয় এবং ক্লাসের পরিবেশের ওপর। একজন দক্ষ শিক্ষক এই সবকটি পদ্ধতির একটি মিশ্রণ তৈরি করে ক্লাসরুমকে একটি জীবন্ত ও আনন্দময় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করতে পারেন।

মূল উদ্দেশ্য হলো ছাত্র-ছাত্রীদের মনে জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা, যাতে তারা শুধু পরীক্ষার জন্য না পড়ে, বরং আজীবন শেখার আনন্দে মেতে থাকে।

এখন আপনার পালা! আপনার মতে, আজকের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর? কিংবা আপনার নিজের ছাত্রজীবনের কোনো মজার শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা থাকলে আমাদের কমেন্ট করে জানান! আমরা আপনার মতামত শোনার অপেক্ষায় রইলাম।

Leave A Reply