শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ বা শিশুবর্ধন :

শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ বা শিশুবর্ধন :

0 331

শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ বা শিশুবর্ধন :

আজকের পাঠে আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো- শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ বা শিশুবর্ধন, বিকাশের ধারণা, সাধারণ নীতি, বিকাশ ও বৃদ্ধির নিয়ামক, পরিনমন বা পরিপক্কতা ইত্যাদি।

ব্যতিক্রম ছাড়া পৃথিবীর সর্বত্র বিকাশ সার্বজনীন ধারা অনুসরণ করে।

মাতৃগর্ভে ভ্রুন অবস্থা থেকে পূর্ণাঙ্গ মানবসত্তার রূপ পেতে যে সকল পরিবর্তনগুলো দেখা যায় তা নিম্নরূপ:

১. আকারের পরিবর্তন (Change in size) ওজন, উচ্চতা ও দেহের আয়তন বয়স বাড়ার সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।

একই সাথে আভ্যন্তরীন যন্ত্র-হার্ট, পরিপাকতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রেরও পরিবর্তন হয়।

২. অনুপাতের পরিবর্তন (Change in proportion) অতি শৈশবে শিশুর দেহের তুলনায় মাথা ও কপাল বড় এবং ঘাড় ছোট থাকে।

বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথে মাথার সাথে সামঞ্জস্য রেখে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

৩. পুরনো বৈশিষ্টের বিলুপ্তি ঘটা (Disappearance of old features) সহজাত প্রতিবর্তী ক্রিয়া (Reflex) চলে যায়, শিশুর চুলের প্রকৃতি, দুধের দাঁত ও অন্যান্য শিশুসুলভ আচরনের বিলুপ্তি ঘটে।

৪. নতুন বৈশিষ্ট্য অর্জন (Acquisition of new features) : বাল্যকালে নতুন দাঁত ওঠা, কৈশোরে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করে।

জীবনের প্রথম ৫দিনে শিশুর সামগ্রিক ক্রিয়া বৃদ্ধি
জীবনের প্রথম ৫দিনে শিশুর সামগ্রিক ক্রিয়া বৃদ্ধি

 

 

 

 

 

 

একটি শিশু মাতৃগর্ভে ভ্রুণ থেকে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়ে একটি মানবসত্তার রূপ নেয়।

স্বাভাবিক নিয়মে চল্লিশ সপ্তাহ মাতৃগর্ভে অবস্থানের পর এই মানবসত্ত্বা পৃথিবীতে আসে।

এরপর শিশুটি বিভিন্ন বয়সে বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়ে জীবনের কতগুলো ধাপ অতিক্রম করে।

এক্ষেত্রে যেমন শিশুর শারীরিক পরিবর্তন হতে থাকে তেমনি শিশু নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য আচরণিক দক্ষতা অর্জন করতে থাকে।

এই পরিবর্তনসমূহকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যথা: আকার-আকৃতিগত পরিবর্তন বা বৃদ্ধি(growth) এবং আচরণগত পরিবর্তন বা বিকাশ (development)।

শিক্ষার উদ্দেশ্য শিশুর বয়স অনুসারে বৃদ্ধিও বিকাশ সুষ্ঠুভাবে ঘটতে সহায়তা করা, যাতে সে একজন সুনাগরিক হিসেবে সমাজে স্থান করে নিতে পারে।

এই কাজটি করার দায়িত্ব শিক্ষক, পিতামাতা ও অভিভাবকদের।

শিক্ষককে তাঁর এইগুরু দায়িত্ব পালন করার জন্য অবশ্যই শিশুর বৃদ্ধিএবং বিকাশের ধারা ও উপাদান সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক।

আমরা অনেক সময়ই বলি, “বাহ্! তোমার ছেলেটি তো বেশ বড় হয়ে উঠেছে।”

এক্ষেত্রে আমরা ছেলেটির উচ্চতা যে বৃদ্ধি পেয়েছে, এ কথাই বোঝাই।

শিশুর উচ্চতার সাথে সাথে ওজন বৃদ্ধি হয় এবং তার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেরও বৃদ্ধি ঘটে। এটি হলো শিশুর দৈহিক পরিবর্তন (growth) যা মূলত শিশুর পরিমাণগত পরিবর্তনকে বোঝায়।

সহজ ভাষায় বৃদ্ধি বলতে শুধুমাত্র শিশুর আকার-আয়তনের অর্থাৎ ওজন ও উচ্চতায় পরিবর্তন বা বড় হওয়াকে বোঝায় যা সহজে দেখা যায়।

শিশুর বৃদ্ধি যেহেতু দৈহিক, কাজেই তা সহজে পরিমাপ করা যায়। তাছাড়া মানুষের শারীরিক বৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে।

একজন মানুষের উচ্চতা বয়সের অনুপাতে বৃদ্ধি হতে থাকে, কিন্তু এক পর্যায়ে তার উচ্চতা একটি শেষ সীমায় পৌঁছে।

তারপর আর বাড়ে না। সুতরাং বৃদ্ধির একটি সমাপ্তি রয়েছে। জন্ম পরবর্তীকালে যে সব ক্ষেত্রে দৈহিক বৃদ্ধি হয়ে থাকে তা নিম্নরূপ:

 

উচ্চতা :  জন্মের সময় আমাদের দেশে সাধারণত একটি শিশুর উচ্চতা ১৭ থেকে ২০ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে।

এরপরে বয়স বাড়ার সাথে সাথে উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

প্রথম ৭-৮ বছরে শিশুর উচ্চতা অতি দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও পরবর্তীতে এর গতি অনেক ধীর হয়ে যায়।

 

ওজন : জন্মের সময় শিশুর ওজন সাধারণত ৬-৭ পাউন্ড হয় বা তার কম-বেশি হয়ে থাকে এবং শিশু জন্মের পর প্রথম বছর ওজন খুব দ্রুত বাড়ে।

ছয় মাসে শিশুর ওজন দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং এক বছরে তিন গুণ হয়।

 

আকার : বয়স বাড়ার সাথে সাথে যেহেতু শিশুর ওজন, উচ্চতায় পরিবর্তন আসে, তাতে তার সার্বিক আকারেও পরিবর্তন আসে, যা আমরা সাধারণভাবে পর্যবেক্ষণ করি এবং শিশুর বৃদ্ধি সহজেই বুঝতে পারি।

চিত্র: শিশু বিকাশের ক্রমধারা
চিত্র: শিশু বিকাশের ক্রমধারা

 

 

বিকাশের ধারণা

বিকাশ হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক, অব্যাহত ও সমষ্টিগত প্রক্রিয়া।

মানব শরীর জন্মগতভাবেই নতুন নতুন উদ্দীপনা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকে।

সর্বদা উদ্দীপনার ফলে মস্তিষ্ক ও শরীর ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা লাভ করতে থাকে।

দৃষ্টিগ্রাহ্য শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি শশুরি অভ্যন্তরীণ চিন্তা-চেতনার পরিবতর্নের প্রকাশ ঘটে তার আচার আচরণে।

এরূপ মানসিক বা আচরণিক গুণাবলীর পরিবর্তনকে শিশুর বিকাশ (Development) বলে।

বুদ্ধিদীপ্ত এবং মননশীল জাতিগঠনের জন্য দেশের মানব সম্পদ উন্নয়ন অতি জরুরী।

মানব সম্পদ উন্নয়ন ছাড়া কোন জাতি উন্নত হতে পারে না।

দেশের শিশু গোষ্ঠীর পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরির মাধ্যমেই দেশকে উন্নত করা সম্ভব।

বিকাশ যেহেতু দৃষ্টিগ্রাহ্য নয় তাই সহজে পরিমাপ করা যায় না। তবে বিভিন্ন চেকলিস্ট এবং অভীক্ষা ব্যবহার করে বিকাশ পরিমাপ করা সম্ভব।

বিকাশের সাধারণ নীতি :

১. বিকাশ ক্রমধারা এবং পূর্ব নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী হয় এবং বিকাশের মধ্যে সহসম্পর্ক রয়েছে: যদিও কোন দুটি শিশুই একরকম নয়,তথাপি সকল শিশুই একটি সাধারণ ক্রমধারা অনুসরণ করে;

২. বিকাশের ধারায় সাদৃশ্য রয়েছে যেমন প্রথমে ঘাড় শক্ত হয়, হামাগুড়ি দেয়, বসে, দাঁড়ায় এবং এরপর শিশু হাটে;

৩. বিকাশের ধারা ক্রমসংযোজনশীল অর্থাৎ বিভিন্ন ধাপের মধ্য দিয়ে বিকাশ সম্পন্ন হয়;

৪. বিকাশ প্রক্রিয়া খুবই জটিল: শরীরের বিভিন্ন অংশের বৃদ্ধি বিভিন্ন হারে হয়।মাতৃগর্ভে মাথা দ্রূত বাড়ে।

জন্মের পর ধড়, হাত, পা দ্রূত বাড়ে। শৈশবকালের শেষে শারীরিক বৃদ্ধি মন্থর হয় এবং কৈশোরোত্তরকালে তা আবার দ্রুত হয়।

ক্ষুদে শিশুদের মধ্যে কল্পনা প্রবণতা,আত্নকেন্দ্রিকতা দেখা যায়। অন্যদিকে ৯-১০ বছরের কিশোরদের মধ্যে বাস্তবমূখিতা,যুক্তিপূর্ন চিন্তার উন্মেষ ঘটে;

৫. বিকাশ দুটি বিশেষ ধারায় সংগঠিত হয়:

(ক) সেফালোকডাল (Cephalocaudal): ভ্রুন অবস্থায় এবং জন্ম পরবর্তী সময়ে বিকাশের গতি ধীরে ধীরে মাথা হতে পায়ের দিকে অগ্রসর হয়;

(খ) প্রক্সিমোডিস্টাল (Proximodistal): শিশু প্রথমে চোখ,মাথা ও ঘাড় এবং পরে বাহু,কনুই অর্থাৎ বিভিন্ন অঙ্গের কাজ কেন্দ্র হতে বাইরের দিকে এই নিয়মে সংগঠিত হয়;

৬. বিকাশ সাধারন থেকে বিশেষ ভাবে ঘটে- প্রথমে পুরো শরীর এগিয়ে দেয় ক্রমে হাত বা পা বাড়ায় ।

প্রথমে সবগুলো আঙুল মুঠো করে র,ধীরেধে ধীরে ৩,২ বা ১টি আঙ্গুলের ব্যবহার করতে শেখে;

 

৭. বিকাশের ধারা প্রথমে বিচ্ছিন্ন ও ক্রমে সমন্বিত হয়:

একটি একক ডিম্ব কোষের বিভক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গের অধিকারী মানব শিশুর রূপ ধারন করে।

ঠিক সেভাবেই মানসিক বিকাশ-বুদ্ধির সাথে আগ্রহ, মনোযোগ, আবেগ, ইচ্ছা সবই স্বতন্ত্রভাবে পরিবর্তিত হয়।

যেগুলো পরবর্তীতে একটি অন্যটি দ্বারা প্রভাবিত হয়;

৮. প্রতিটি শিশু অনন্য বা স্বতন্ত্র্য ভিন্ন বংশগতি ও ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে এই স্বাতন্ত্র্যতা লক্ষ্য করা যায়;

৯. পরিপক্কতা ও শিখন বিকাশকে প্রভাবিত করে;

১০. বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে সংকটকাল বা বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে, শিশুর জন্মের পর ২৮ দিন, প্রথম ২ বৎসর, বয়ঃসন্ধিকাল; এছাড়াও প্রতিটি পর্যায়ই সঠিকভাবে বিকাশ না হলেই সংকট দেখা দিতে পারে।

 

বিকাশের নীতিগুলো পিতামাতা, অভিভাবক ও শিক্ষক সকলের জানা থাকলে বিকাশের কোথাও অনিয়ম হলে সেটি সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন।

এবং যত দ্রতু সম্ভব চিহ্নিত করে বিশেষজ্ঞের দ্বারা প্রারম্ভিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে শিশু, তার পিতামাতা, অভিভাবক, সমাজ সকলেই উপকৃত হতে পারে।

শিশুকে পরিপূর্ণতার সাথে বিকশিত করতে শিশুর সাথে সম্পর্কিত সকলের শিশু সম্পর্কে সুগভীর ও সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

 

 বিকাশ ও বৃদ্ধির নিয়ামক:

১.বংশগতি (Heredity):

জন্মের সময় পিতামাতা এবং পূর্ব পুরুষদের নিকট থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিয়ে আসা বৈশিষ্ট্যসমূহকে বংশগতি বলে।

অর্থাৎ যে প্রক্রিয়ায় পিতামাতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সন্তানসন্ততির দেহে বংশপরম্পরায় সঞ্চারিত হয়, তাকে বংশগতি বলে

বংশগতির বাহক জীন নামের অসংখ্য ক্ষুদ্র দানা যা ক্রোমোজমের উপাদান।

বংশাণু বা জীন (Gene) শিশুর দৈহিক,মানসিকএবং স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারন করে যা পরবর্তীতে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে।

দৈহিক বৈশিষ্ট্য বলতে দেহের গঠন, মুখের গড়ন, চোখের রং, চুলের রং,দেহের বর্ণ ইত্যাদিকে বুঝায়।মানসিক বৈশিষ্ট্য হলো-বুদ্ধিমত্তা, চিন্তা, কল্পনা, যুক্তি, অনুধাবন, স্মৃতি ইত্যাদি।

এছাড়াও আমাদের দেহের অভ্যন্তরে অবস্থিত কর্ম ইন্দ্রিয় হলো গ্রন্থি (Gland)। বিভিন্ন গ্রন্থির নি:সরন আমাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে সহায়তা করে।

 

২. পরিবেশ: শুক্রানু ও ডিম্বানুর মিলনের ফলে মাতৃগর্ভে যে জাইগোটের সৃষ্টি হয় সেখান থেকেই শিশুর পরিবেশের শুরু।

মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষাবিজ্ঞানের ভাষায় পরিবেশের অর্থ যেমন ব্যাপক তেমনি বিচিত্র।

এর বিস্তৃতি অনির্দিষ্ট।

অর্থাৎ যে অনির্দিষ্ট ভৌত সীমানার মধ্যে অর্ন্তর্ভূক্ত থাকে সমস্ত প্রকৃতিগত বস্তু, ঘটনা, সামাজিক,সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড যা কোন ব্যক্তির উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন না কোন ভাবে প্রভাব বিস্তার করে ব্যক্তির আচরনের কিছুমাত্র পরিবর্তন ঘটায় তাই তার পরিবেশ।

পরিবেশ মূলত: একটি চলমান বা গতিশীল শক্তি-যা ব্যক্তির আচরনে যে কোন ধরনের পরিবর্তন বা পরিবর্ধন ঘটাতে পারে।

জন্ম থেকে শিশু নানাবিধ পরিবেশের সন্মুখিন হয়-কখনও জ্ঞাতসারে কখনও অজ্ঞাতে।

আর এর প্রভাবও হয় কখনও প্রত্যক্ষ কখনও পরোক্ষভাবে।

প্রতিটি জীবকে সর্বক্ষনই তার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়। অন্যথায় অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।

পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেয়ার এই প্রচেষ্টাকে সঙ্গতি বিধান বা অভিযোজন (Adaptation) বলে।

আর পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন করতে যেয়েই মানব জীবনের প্রতিটি মূহূর্তের আচরনের যে পরিবর্তন সংঘটিত হয় তাই শিক্ষা।

মৌলিক ও পরিপূরক চাহিদা
চিত্র ২: শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য মৌলিক ও পরিপূরক চাহিদা সমূহ

চিত্র ২: শিশুরবৃদ্ধি ওবিকাশের জন্য মৌলিক ও পরিপূরক চাহিদা সমূহ

 

শিশুর সঠিক বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন পরিমিত মাত্রায় পুষ্টি,স্বাস্থ্য সেবা ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং খেলাধূলার প্রচুর সুযোগ।

একই  ভাবে  বিকাশের  জন্য  সুযোগ  করে  দিতে  হবে  বিভিন্ন  বয়সের  মানুষের  সাথে  পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ। শিশুর স্বাস্থ্য  ভাল থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার যেন পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

কারন যথাযথ পুষ্টি শিশুর মস্তিষ্কের কার্যাবলিসহ সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বৃদ্ধি ঘটিয়ে তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

 

পরিনমন বা পরিপক্কতা (Maturity):

শিশুর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে জন্ম সূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্যে পূর্ণাঙ্গ বিকাশকে পরিনমন বলে।

পরিনমন হলো একটি বৃদ্ধির প্রক্রিয়া, যেখানে কিছু শক্তিশালী উপাদান শিশুর বিকাশের প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, এই উপাদান গুলির বেশির ভাগই সহজাত।

শিশুর অভ্যন্তরীণ চটপডুতা, চিন্তা-চেতনা ও বিভিন্ন অঙ্গের সূক্ষ্ম ব্যবহারের দ্বারা পেশী সঞ্চালনের দক্ষতার মাধ্যমে পরিপক্কতা লাভ করে।

অর্থাৎ শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলে শিশুর স্বাভাবিক ও সার্বিক বিকাশই পরিনমন।

উদাহরণ: হাঁটার জন্য শুধু পায়ের শক্তি এবং পেশীর সমন্বয় থাকলে হয়না, তার সাথে প্রয়োজন কিছু কৌশলগত দিক যা শিশুকে অর্জন করতে হয়।

অর্থাৎ বিকাশের সাথে পরিনমন ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত ।

 

শিক্ষাক্ষেত্রে পরিনমনের ভূমিকা

১) শিক্ষাক্ষেত্রে পরিনমনের গুরুত্ব অপরিসীম। তাছাড়া উপযুক্ত পরিনমন শিখনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২) শিশুর স্তরে স্তরে আচরণ গুলির উন্নতি ঘটানো যেতে পারে পরিকল্পিত ও বাঞ্ছিত শিখনের মাধ্যমে।

৩) শিখনের সীমা পরিনমনের দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকে।

৪) শিশুর স্তর অনুসারে শিখনকে কার্যকরী করতে হয়, সে কারণে শৈশবের পর  থেকে পরবর্তী জীবনে পরিনমনের প্রভাব কমে যায়।

৫) পরিনমনের ফলে ব্যাক্তির আচরণেও পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে শিখন প্রক্রিয়ায় খুব সহজেই  নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।

৬) শিখন প্রক্রিয়া হচ্ছে অর্জিত বিকাশমূলক মানসিক প্রক্রিয়া যা পরিনমনের দ্বারা প্রভাবিত ।

৭) পরিনমনের উপর নির্ভর করে শিক্ষাদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, অর্থাৎ পরিনমনই নির্ধারণ করে দেয় কোন বয়সে কী ধরণের শিখন কার্যকরী হবে।

শিশুদের দেহের পরিমাণগত পরিবর্তন অর্থাৎ দেহের আয়তন ( দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা) ও ওজন বাড়ানোকে বলে বৃদ্ধি ।

এই প্রসঙ্গে মনোবিদ Arnold Gessel বলেছেন-” growth is a function of the organism rather than of the environment as such” অর্থাৎ বৃদ্ধি হল দেহ যন্ত্রের ক্রিয়া যা পরিবেশের ক্রিয়া দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত হয় না।

বৃদ্ধি এবং বিকাশের মধ্যে পার্থক্য ( Difference between growth and development):

বৃদ্ধি হল আকার বা আয়তনের পরিবর্তন অর্থাৎ দৈর্ঘ্য ভজনের পরিবর্তনকে বৃদ্ধি বলে।

অপরপক্ষে বিকাশ হল আকৃতি ও ক্রিয়ার পরিবর্তন। যার দ্বারা ব্যাক্তি যেকোনো জাগতিক ক্রিয়া-কলাপ কে আরো বেশি দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারে।

বৃদ্ধি হল পরিমাপ যোগ্য। অপরপক্ষে বিকাশ হল পর্যবেক্ষণযোগ্য।

বৃদ্ধির সাধারণ বৈশিষ্ট্য সমূহ( General characteristics of growth):

জন্মের পর থেকে শিশুর বৃদ্ধি ঘটনের সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষণা থেকে মনোবিজ্ঞানীরা বৃদ্ধির যে বৈশিষ্ট্যগুলো নির্ণয় করেছেন তা তুলে ধরা হলো-

  1.  শিশুর বৃদ্ধি ঘটে বংশগতি ও পরিবেশগত মিথস্ক্রিয়ার ফলে ।
  2. জন্মের পর থেকে শিশুর দৈহিক বৃদ্ধির হার বিভিন্ন বয়সে কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে।
  3. একটি শিশুর জন্ম থেকে আড়াই বছর বয়স পর্যন্ত দৈহিক বৃদ্ধির হার খুব দ্রুত হয়।
  4. আড়াই বছর বয়স থেকে ১২ কিংবা ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর দৈহিক বৃদ্ধির হার কমে যায়।
  5. ১৫-১৬ বছর বয়সে কৈশোরে দৈহিক বৃদ্ধির হার আবারও বেড়ে যায়।
  6.  মেয়েদের ১৮এবং ছেলেদের বিশ একুশ বছর বয়স পর্যন্ত দৈহিক বৃদ্ধি ঘটতে থাকে যদিও তা ধীরগতিতে।

 

বিকাশের সাধারণ বৈশিষ্ট্য সমূহ( General characteristic of development):

বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে মনোবিদ্যা সাধারণ বৈশিষ্ট্য সমূহ নিরুপন করেছেন তা হল-

i) অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া: বিকাশ জীবনকাল ব্যাপী একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া( development is a continuous process)।

মাতৃগর্ভে ভ্রূণ অঞ্চলের মুহূর্ত থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন চোখে পড়ে না।

ii) ক্রমসংযোজনশীল প্রক্রিয়া: বিকাশ একটা ক্রমসংযোজনশীল প্রক্রিয়া অর্থাৎ ব্যক্তির বিকাশের যেকোনো পর্যায়ে তার পূর্ববর্তী সকল পর্যায়ের বিকাশের সমষ্টির ফল।

ব্যক্তি জীবনে বিকাশ (শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ ) কোন বিশিষ্ট মুহূর্তে হঠাৎ করে আসে না, বিকাশের যেকোনো পর্যায়ে তার পরবর্তী পর্যায় থেকেই আছে।

iii) সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রক্রিয়া: বিকাশের ধারা সামঞ্জস্যপূর্ণ, করণ কোন আচরণের পর কোন আচরণ হবে তা মোটামুটি নির্দিষ্ট।

যেমন- প্রত্যেক মানব শিশু প্রথমে হামাগুড়ি দেবে, তারপর হাটতে শিখবে।

iv) শৃঙ্খলিত প্রক্রিয়া ( development is discipline process):

মানব জীবনে বিভিন্ন দিকের বিকাশের মধ্যে একটি শৃঙ্খলা রক্ষা করে।

একদিকের বিকাশ অপরদিকের বিকাশে সহায়তা করে।

যেমন- দৈহিক বিকাশ মানসিক বিকাশ এবংমানসিক বিকাশ সামাজিক বিকাশে সহায়তা করে অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে সমস্ত ধরনের বিকাশে ব্যক্তিজীবনে একটি শৃঙ্খলা বজায় রাখে ।

v) জটিল প্রক্রিয়া:

মানবজীবনে বিকাশ একটি উন্নত জটিল প্রক্রিয়া( development is a complex process)।

বিকাশের ধারায় দেখা যায়, কোন বিশেষ সময়ে মানসিক বিকাশের তুলনায় দৈহিক বিকাশের হার বেশি হয় ।

দেখা যায় কখনো দৈহিক বিকাশের তুলনায় মানসিক বিকাশ অনেক বেশি হয়ে থাকে।

কোন কোন সময় বিভিন্ন দিকের বিকাশ বিভিন্ন দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন হয় । এই বিকাশের হার সাধারণত কোন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে না।

 

Cephalocaudal এবং Proximodistal Principle এর মধ্যে পার্থক্য বা সম্পর্ক:

Cephalocaudal (সিফালোকৌডাল):

(১) সিফালোকৌডাল বিকাশ মূলত মাথা নীচ থেকে শুরু হওয়া বৃদ্ধি এবং বিকাশকে বোঝায়।

(২) প্রথমে ঘাড়ের পেশীগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে যা তাদের মাথা স্থির রাখতে সহায়তা করে।

(৩) এই ধাপে মাথা সরাতে পারে ও শিশুর ঘাড় শক্ত হয়।

(৪) শেষধাপে মাথা উপরে ধরে রাখতে পারে।

 

Proximodistal (প্রক্সিমোডিস্টাল):

(১) শরীরের কেন্দ্র বা কোর থেকে বাইরের দিকে ঘটাই হলো প্রক্সিমোডিস্টাল বিকাশ।

(২) Proximodistal বিকাশকালিন প্রথমে মেরুদণ্ড বিকশিত হয়।

(৩)  ধীরে ধীরে বা ক্রমান্বয়ে বাহু, হাত ও হাতের আঙ্গুলগুলি বিকশিত হয়।

(৪)  শেষধাপে পা ও পায়ের আঙ্গুল বৃদ্ধি পায়।

 

পেশাগত-১ এ আগের পাঠ এখানে

ডিপিএড এর অন্যান্য পাঠ এখানে

 

শিশু সংক্রান্ত অধিক তথ্য পড়ৃন উইকিপিডিয়া থেকেে

ইউনিসেফ এর লিংক

 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments
Loading...