বেঞ্জামিন ব্লুম এর শিখন তত্ত্ব

পড়াশোনা কি আপনার কাছে কঠিন মনে হয়? শুধু মুখস্থ করে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন? ভাবছেন, ইশশ, যদি শেখার কোনো সহজ আর কার্যকরী উপায় থাকত! আমাদের দেশে এখনও অনেক সময় শুধু মুখস্থ করার ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু সত্যিই যদি বুঝে বুঝে শিখতে চান, তাহলে বেঞ্জামিন ব্লুম নামের এক ভদ্রলোকের একটা দারুণ বুদ্ধি আছে!

ব্লুমের এই শেখার পদ্ধতি সারা পৃথিবীতে খুব জনপ্রিয়। এটা আসলে শেখার প্রক্রিয়াটাকে ধাপে ধাপে ভাগ করে দেখায়। এতে শিক্ষকরা যেমন ভালোভাবে শেখাতে পারেন, তেমনি শিক্ষার্থীরাও সহজে শিখতে পারে।

এই লেখায় আমরা দেখব ব্লুমের এই তত্ত্বটা আসলে কী, এর ধাপগুলো কেমন, বাংলাদেশের পড়ালেখায় এটা কিভাবে কাজে লাগানো যায়, আর আপনি নিজে কিভাবে এটা ব্যবহার করে আরও ভালো শিখতে পারবেন।

এক নজরে বেঞ্জামিন ব্লুমের শিখন তত্ত্ব

বেঞ্জামিন ব্লুমের শিখন তত্ত্ব শেখার প্রক্রিয়াকে ছয়টি ধাপে ভাগ করেছে। এগুলো হলো: মনে রাখা, বোঝা, প্রয়োগ করা, বিশ্লেষণ করা, মূল্যায়ন করা এবং নতুন কিছু তৈরি করা। এই পদ্ধতিটা শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদেরকে গভীরভাবে শিখতে সাহায্য করে।

বেঞ্জামিন ব্লুমের শিখন তত্ত্ব সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্য

  • ব্লুম সাহেব ১৯৫৬ সালে প্রথম এই তত্ত্বটা দেন। 

  • পরে ২০০১ সালে এটাকে আরেকটু নতুন করে সাজানো হয়। 

  • শুধু পড়ালেখা নয়, এটা আমাদের অনুভূতি এবং শারীরিক কাজ শেখার ক্ষেত্রেও কাজে লাগে। 

  • পৃথিবীর বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সিলেবাস বানানোর সময় ব্লুমের এই তত্ত্বটা ব্যবহার করে। 

  • আমাদের বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (NCTB) সিলেবাস তৈরিতেও এই তত্ত্বের প্রভাব আছে। 

  • এই তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য হলো শুধু তথ্য মুখস্থ না করে, সেগুলোকে ভালোভাবে বুঝতে এবং কাজে লাগাতে শেখা। 

ব্লুমের শিখন তত্ত্বের ৬টি ধাপ: কী আর কেন?

  • সহজ ব্যাখ্যা + উদাহরণ: ব্লুম দেখিয়েছেন আমরা কোনো কিছু শিখলে সেটা মস্তিষ্কে ধাপে ধাপে কাজ করে।

    • মনে রাখা: এটা সবচেয়ে সহজ ধাপ। যেমন: “বাংলাদেশের রাজধানীর নাম কী?” – সহজ উত্তর “ঢাকা”।

    • বোঝা: যা মনে রেখেছেন, সেটার অর্থ বোঝা। যেমন: “ভাষা আন্দোলন কেন হয়েছিল?” – আপনি কারণটা গুছিয়ে বলতে পারছেন।

    • প্রয়োগ করা: যা শিখেছেন, তা নতুন কোনো কাজে লাগানো। যেমন: অংকে একটা সূত্র শিখেছেন, সেটা ব্যবহার করে নতুন একটা সমাধান করলেন।

    • বিশ্লেষণ করা: কোনো কিছুকে ছোট ছোট অংশে ভেঙে দেখা যে তারা একে অপরের সাথে কিভাবে জড়িত। যেমন: একটা গল্পের চরিত্রগুলো কেন এমন কাজ করল, সেটা বিশ্লেষণ করা।

    • মূল্যায়ন করা: কোনো কিছু সম্পর্কে নিজের মতামত দেওয়া, কোনটা ভালো বা খারাপ তা বিচার করা। যেমন: একটা নতুন প্রোডাক্ট কেমন, সে সম্পর্কে আপনার রিভিউ দেওয়া।

    • তৈরি করা: যা শিখেছেন, সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু তৈরি করা। যেমন: একটা নতুন ডিজাইন করা, বা একটা গান লেখা।

  • বাংলাদেশে যা ঘটে: আমাদের দেশের পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্নগুলো এই ধাপগুলোকে কাজে লাগিয়েই তৈরি হয়।

  • দেখুন এক নজরে:
    | ধাপ | আপনি কী করেন? | উদাহরণ |
    | :— | :———– | :—— |
    | মনে রাখা | তথ্য স্মরণ করেন | তারিখ মনে রাখা |
    | বোঝা | তথ্যের অর্থ বোঝেন | কেন বৃষ্টি হয়? |
    | প্রয়োগ করা | শেখা জ্ঞান ব্যবহার করেন | ফোন নম্বর ডায়াল করা |
    | বিশ্লেষণ করা | বিষয়বস্তু ভেঙে দেখেন | কোনো ঘটনার কারণ খোঁজা |
    | মূল্যায়ন করা | বিচার করে মতামত দেন | কোনটা ভালো/খারাপ বলা |
    | তৈরি করা | নতুন কিছু বানান | নতুন গল্প লেখা |

আমাদের দেশের পড়ালেখায় ব্লুমের তত্ত্ব কিভাবে কাজে লাগে?

  • আপনার প্রশ্ন, আমাদের উত্তর:

    • শিক্ষকরা কিভাবে এটা ব্যবহার করবেন? শিক্ষকরা ক্লাসে শুধু বই পড়িয়ে না দিয়ে বিভিন্ন মজার কাজ (যেমন: আলোচনা, প্রোজেক্ট) দিতে পারেন, যা এই ধাপগুলো পেরিয়ে যেতে সাহায্য করে।

    • এটা কি শুধু ছোটদের জন্য? না, স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে ইউনিভার্সিটির পড়ালেখা, এমনকি কোনো নতুন দক্ষতা শেখার জন্যও এই পদ্ধতি দারুণ কাজে লাগে।

  • একটা ছোট্ট গল্প: ধরুন রনি স্যার নামে একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি দেখতেন তার ছাত্রছাত্রীরা শুধু মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেত, কিন্তু আসল জিনিস বুঝত না। এরপর তিনি ব্লুমের তত্ত্ব ব্যবহার করে ক্লাস নিতে শুরু করলেন। তিনি শুধু বইয়ের কথা না শিখিয়ে, একটা স্থানীয় সমস্যা নিয়ে তাদের একটা প্রোজেক্ট দিলেন। ছাত্রছাত্রীরা সেই সমস্যাটা বিশ্লেষণ করল, নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে সমাধান বের করল, আর শেষ পর্যন্ত একটা দারুণ রিপোর্ট তৈরি করল। এতে শুধু নম্বর নয়, তাদের শেখার পদ্ধতিটাই বদলে গেল!

ব্লুমের তত্ত্ব ব্যবহারের সুবিধা-অসুবিধা ও কিছু কৌশল

  • গভীরভাবে বুঝুন:

    • সুবিধা: এটা শেখার উদ্দেশ্যকে পরিষ্কার করে। শিক্ষার্থীদেরকে গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখায়। পরীক্ষা বা মূল্যায়নের পদ্ধতিকে আরও ভালো করে তোলে।

    • চ্যালেঞ্জ: শিক্ষকদের একটু বেশি প্রস্তুতি নিতে হয়। সব সময় মুখস্থ করার অভ্যাস থেকে বের হয়ে আসা কঠিন হতে পারে।

    • যেমন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে: এখানকার কিছু বিভাগে শিক্ষার্থীদেরকে শুধু লেকচার না দিয়ে গবেষণামূলক কাজ করানো হয়, যা ব্লুমের তত্ত্বের উচ্চতর ধাপগুলোকে কাজে লাগায়।

  • এক নজরে তুলনা:
    | ভালো দিক (সুবিধা) | খারাপ দিক (চ্যালেঞ্জ) |
    | :—————– | :—————– |
    | শেখার লক্ষ্য পরিষ্কার হয় | শেখাতে বেশি সময় লাগে |
    | গভীরভাবে ভাবতে শেখায় | শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের দরকার হয় |
    | ভালোভাবে পরীক্ষা নেওয়া যায় | সব বিষয়ে প্রয়োগ করা কঠিন |

ধাপে ধাপে শেখার গাইড

  • শিক্ষকরা কিভাবে একটা পাঠ পরিকল্পনা করবেন:

    1. লক্ষ্য ঠিক করুন: ক্লাসের শেষে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে (ব্লুমের কোন ধাপ)?

    2. বিষয়বস্তু: কী শেখাতে চান?

    3. প্রশ্ন তৈরি: প্রতিটি ধাপের জন্য প্রশ্ন তৈরি করুন।

    4. কাজের পরিকল্পনা: শিক্ষার্থীরা কিভাবে সক্রিয়ভাবে শিখবে, তার জন্য কাজ ঠিক করুন।

    5. মূল্যায়ন: শিক্ষার্থীরা লক্ষ্য পূরণ করতে পারল কিনা, তা যাচাই করুন।

কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

  • ব্লুমের শিখন তত্ত্ব কী বোঝায়?

    উত্তর: এটা একটা সাজানো পদ্ধতি যা দেখায় আমরা কিভাবে ধাপে ধাপে কোনো কিছু শিখি, যেমন মনে রাখা থেকে শুরু করে নতুন কিছু তৈরি করা পর্যন্ত।

  • এর প্রধান ৬টা ধাপ কী কী?

    উত্তর: মনে রাখা, বোঝা, প্রয়োগ করা, বিশ্লেষণ করা, মূল্যায়ন করা এবং তৈরি করা।

  • বাংলাদেশের পড়ালেখায় এর কোনো প্রভাব আছে কি?

    উত্তর: হ্যাঁ, আমাদের সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে এই তত্ত্বের প্রভাব দেখা যায়, যা শিক্ষার্থীদেরকে শুধু মুখস্থ না করে বুঝে পড়তে উৎসাহ দেয়।

  • এটা কি শুধু ক্লাসের পড়ালেখায় কাজে লাগে?

    উত্তর: না, ক্লাসের বাইরে নতুন কোনো দক্ষতা শেখার ক্ষেত্রেও এটা খুব সহায়ক।

  • ব্লুমের তত্ত্ব কিভাবে শেখার মান ভালো করে?

    উত্তর: এটা শিক্ষার্থীদেরকে শেখার গভীরে যেতে, বিশ্লেষণ করতে এবং নিজেদের মতো করে নতুন কিছু তৈরি করতে সাহায্য করে, যার ফলে শেখাটা আরও কার্যকর হয়।

সাধারণ ভুল বা যে বিষয়ে সাবধান থাকবেন

  • ভুলগুলো:

    • শুধু সহজ ধাপগুলো (যেমন: মনে রাখা) নিয়েই ব্যস্ত থাকা।

    • এই ধাপগুলোকে ঠিকমতো না বোঝা বা ভুলভাবে ব্যবহার করা।

    • শিক্ষার্থীদের জন্য সঠিক প্রশ্ন বা কাজ তৈরি করতে না পারা।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট

  • অন্যান্য বিষয়: শেখার বিভিন্ন দিক (যেমন: আবেগ বা শারীরিক দক্ষতা), গভীর চিন্তা।

  • আমাদের দেশের সংস্থা: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB), শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

  • বাংলাদেশের উদাহরণ: আমরা কিভাবে ছোটবেলা থেকে মুখস্থ করে বড় হয়েছি, কিন্তু এখন সৃজনশীল পদ্ধতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে ব্লুমের তত্ত্বের দিকে যাচ্ছি।

শেষ কথা

  • মূল পয়েন্ট:

    • ব্লুমের শিখন তত্ত্ব আপনার শেখার পদ্ধতিকে দারুণভাবে উন্নত করতে পারে।

    • এর ধাপগুলো শিক্ষকদের শেখাতে আর শিক্ষার্থীদের বুঝতে সাহায্য করে।

    • বাংলাদেশে এটা ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারলে শিক্ষার মান আরও ভালো হবে।

  • আপনার জন্য পরামর্শ: আপনিও এই তত্ত্ব ব্যবহার করে দেখুন! শুধু মুখস্থ না করে বুঝে বুঝে শিখুন, আর দেখুন আপনার পড়ালেখা কতটা সহজ ও মজাদার হয়ে ওঠে। এই বিষয়ে আপনার কোনো প্রশ্ন বা মতামত থাকলে, নিচে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না!

তথ্যসূত্র

  • বইয়ের নাম: Taxonomy of Educational Objectives, Handbook I: The Cognitive Domain

  • বইয়ের নাম: A Taxonomy for Learning, Teaching, and Assessing: A Revision of Bloom’s Taxonomy of Educational Objectives

ওয়েবসাইটের জন্য বাড়তি তথ্য

  • লেখক পরিচিতি: তানভীর আহমেদ একজন শিক্ষাবিদ ও কারিকুলাম ডিজাইনার, যিনি গত ১০ বছর ধরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন এবং ব্লুমের শিখন তত্ত্বের প্রয়োগ নিয়ে একাধিক গবেষণা করেছেন।

  • পর্যালোচনা করেছেন: ড. ফাহমিদা সুলতানা, শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

  • প্রকাশের তারিখ: ২৯ আগষ্ট, ২০২৫ খ্রি.

  • সর্বশেষ আপডেট: ২৯ আগষ্ট, ২০২৫ খ্রি.

Leave a Comment

Scroll to Top