Take a fresh look at your lifestyle.

শিখনের ক্ষেত্র কয়টি ও কি কি?

0 135

কখনো ভেবে দেখেছেন, আমরা ঠিক কীভাবে শিখি? ব্যাপারটা কি শুধুই বইয়ের পাতা ওল্টানো আর পরীক্ষার খাতায় গড়গড় করে সব লিখে দেওয়া? নাকি এর চেয়েও বেশি কিছু? যদি বলি, আপনার পছন্দের ফুচকা বানানো থেকে শুরু করে, বন্ধুদের আড্ডায় মন খুলে হাসা, কিংবা নতুন কেনা ফোনটার সব ফিচার এক্সপ্লোর করা এই সবকিছুর পেছনেই রয়েছে এক দারুণ শেখার প্রক্রিয়া?

অবাক হচ্ছেন? চলুন, আজ আমরা জানব, শিখনের ক্ষেত্র আসলে কয়টি ও কী কী এবং কীভাবে এই ক্ষেত্রগুলো আমাদের অজান্তেই প্রতিদিনের জীবনকে চালাচ্ছে।

মার্কিন শিক্ষাবিদ বেঞ্জামিন ব্লুম (Benjamin Bloom) ও তাঁর সহকর্মীরা প্রথম এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেন। তাঁরা বলেন, আমাদের শেখাটা মূলত তিনটি প্রধান হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চলে। এই হাইওয়েগুলো হলো:

১. জ্ঞানমূলক ক্ষেত্র (Cognitive Domain): সোজা বাংলায়, আমাদের ‘ব্রেইন’ বা মস্তিষ্ক।
২. অনুভূতিমূলক ক্ষেত্র (Affective Domain): এটা হলো আমাদের ‘হার্ট’ বা হৃদয়।
৩. মনোপেশিজ ক্ষেত্র (Psychomotor Domain): আর এটা আমাদের ‘হ্যান্ডস’ বা হাত-পায়ের কারসাজি।

ব্যাপারটা ঠিক যেন একটা কমপ্লিট প্যাকেজ—মাথা, মন এবং শরীর—এই তিনের সমন্বয়েই আমাদের পুরোপুরি শিখন বা শেখাটা সম্পন্ন হয়। তাহলে আর দেরি কেন? চলুন, এই তিনটি রাস্তায় একটা মজার জার্নিতে বেরিয়ে পড়া যাক!

জ্ঞানমূলক ক্ষেত্র (Cognitive Domain)

জ্ঞানমূলক ক্ষেত্র হলো আমাদের চিন্তার জগৎ। যেকোনো তথ্য জানা, সেটা বোঝা এবং সেই তথ্যকে কাজে লাগানোর পুরো প্রক্রিয়াটাই এখানে ঘটে। বই পড়া, নতুন কিছু মুখস্থ করা বা কোনো সমস্যার সমাধান করা এই সবই আমাদের মস্তিষ্কের খেলা। ব্লুম এই ক্ষেত্রটিকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করেছেন, যা সহজ থেকে কঠিনের দিকে যায়।

(টেবিল: জ্ঞানমূলক ক্ষেত্রের স্তর)

স্তর সহজ বাংলায় মানে উদাহরণ
জ্ঞান (Knowledge) কোনো কিছু মনে রাখা বা মুখস্থ করা। ট্রাফিক লাইটের লাল বাতি দেখলে যে থামতে হয়, এটা মনে রাখা।
অনুধাবন (Comprehension) কোনো বিষয় নিজের মতো করে বোঝা ও ব্যাখ্যা করা। কেন লাল বাতিতে গাড়ি থামানো জরুরি, সেটা বন্ধুকে বুঝিয়ে বলা।
প্রয়োগ (Application) শেখা জ্ঞানকে নতুন কোনো পরিস্থিতিতে কাজে লাগানো। ম্যাপ দেখে ঢাকার এক অচেনা গলি থেকে ঠিকঠাক रास्ता খুঁজে বের করা।
বিশ্লেষণ (Analysis) একটি বড় বিষয়কে ছোট ছোট অংশে ভেঙে তাদের সম্পর্ক বোঝা। ফোনের চার্জ কেন দ্রুত শেষ হচ্ছে, তা খুঁজে বের করতে বিভিন্ন সেটিং (যেমন: ব্রাইটনেস, ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ) চেক করা।
সংশ্লেষণ (Synthesis) ছোট ছোট ধারণা মিলিয়ে নতুন কিছু তৈরি করা। বাসায় থাকা নানা রকম সবজি দিয়ে একটা নতুন ধরনের মিক্সড ভেজিটেবল রান্না করে ফেলা।
মূল্যায়ন (Evaluation) কোনো কিছুর ভালো-মন্দ বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। দুটো স্মার্টফোনের ফিচার তুলনা করে নিজের বাজেটের মধ্যে সেরা ফোনটা বেছে নেওয়া।

দেখলেন তো? আপনি যখন ইউটিউব দেখে নতুন কোনো রেসিপি ট্রাই করেন, তখনও কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক এই সবগুলো ধাপ পেরিয়ে যায়!

অনুভূতিমূলক ক্ষেত্র (Affective Domain)

শিখন মানেই শুধু জ্ঞান বা দক্ষতার ব্যাপার নয়। আমাদের আবেগ, অনুভূতি, দৃষ্টিভঙ্গি এবং মূল্যবোধও এর এক বড় অংশ। কারও বিপদে মন খারাপ হওয়া, প্রিয় দলের জয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়া বা কোনো একটা গান শুনে মন ভালো হয়ে যাওয়া এই সবকিছুই অনুভূতিমূলক শিখনের অংশ। এই ক্ষেত্রটি আমাদের ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্র গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।

চলুন, এর স্তরগুলোও দেখে নিই:

  • গ্রহণ করা (Receiving): কোনো কিছুর প্রতি মনোযোগ দেওয়া বা আগ্রহ দেখানো। যেমন: ক্লাসে শিক্ষক যখন কথা বলছেন, তখন মন দিয়ে তাঁর কথা শোনা।

  • প্রতিক্রিয়া (Responding): কোনো বিষয়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া। যেমন: শুধু শুনেই চুপ না থেকে, ক্লাসের আলোচনায় প্রশ্ন করা বা নিজের মতামত দেওয়া।

  • মূল্য দেওয়া (Valuing): কোনো বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এবং সেটার প্রতি आस्था রাখা। যেমন: সততাকে একটি দারুণ গুণ হিসেবে বিশ্বাস করা এবং সবসময় সত্যি কথা বলার চেষ্টা করা।

  • সংগঠন (Organizing): বিভিন্ন মূল্যবোধকে একত্রিত করে নিজের জীবনে একটি সুসঙ্গত আদর্শ তৈরি করা। যেমন: সততার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রমকেও গুরুত্ব দেওয়া এবং দুটোর মধ্যে সমন্বয় করে চলা।

  • চরিত্রায়ন (Characterization): নিজের মূল্যবোধ অনুযায়ী আচরণ করা এবং সেটাকে অভ্যাসে পরিণত করা। এই পর্যায়ে এসে আপনার মূল্যবোধই আপনার পরিচয় হয়ে ওঠে।

সহজ কথায়, ছোটবেলায় গুরুজনদের সম্মান করার যে শিক্ষা আমরা পাই এবং বড় হয়েও তা মন থেকে পালন করি, সেটাই হলো অনুভূতিমূলক শিখনের একটি বাস্তব উদাহরণ।

মনোপেশিজ ক্ষেত্র (Psychomotor Domain)

শুধু মাথা আর মন খাটালেই তো হবে না, শরীরকেও কাজে লাগাতে হবে! মনোপেশিজ ক্ষেত্রটি মূলত আমাদের শারীরিক দক্ষতা এবং হাত-পেশির সমন্বয়ের সাথে জড়িত। সাইকেল চালানো, সুন্দর করে টাইপ করা, নিখুঁতভাবে ছবি আঁকা বা ক্রিকেট বলে দুর্দান্ত এক ছয় মারা—এই সব কিছুই এই ক্ষেত্রের কারিশমা। এই দক্ষতাগুলো অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিখুঁত হয়।

এর সাধারণ স্তরগুলো হলো:

  • প্রত্যক্ষণ (Perception): কোনো কাজ করার জন্য ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে তথ্য নেওয়া। যেমন: ক্রিকেট বলটা কোনদিকে আসছে, তা চোখ দিয়ে দেখা।

  • প্রস্তুতি (Set): কাজটি করার জন্য শরীর ও মনকে প্রস্তুত করা। যেমন: বলটি মারার জন্য সঠিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ব্যাট ধরার জন্য প্রস্তুত হওয়া।

  • নির্দেশিত প্রতিক্রিয়া (Guided Response): কারও অনুকরণে বা নির্দেশনায় কাজটি করার চেষ্টা করা। যেমন: কোচের দেখানো কৌশল অনুযায়ী ব্যাট চালানো।

  • যান্ত্রিকীকরণ (Mechanism): বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে কাজটি প্রায় অভ্যাসগতভাবে করতে পারা। যেমন: কোনো চিন্তা ছাড়াই নিখুঁতভাবে টাইপ করতে পারা।

  • জটিল প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া (Complex Overt Response): খুব কম পরিশ্রমে দক্ষতার সাথে কাজটি নির্ভুলভাবে করতে পারা। যেমন: একজন পেশাদার গিটারিস্টের কোনো ভুল ছাড়াই দ্রুত ও সাবলীলভাবে গিটার বাজানো।

  • অভিযোজন (Adaptation): শেখা দক্ষতাকে নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করে ব্যবহার করা। যেমন: বৃষ্টির কারণে মাঠ ভেজা থাকলেও একজন দক্ষ ফুটবলারের নিজেকে মানিয়ে নিয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়া।

  • সৃজন (Origination): পুরানো দক্ষতার উপর ভিত্তি করে নতুন কোনো শারীরিক কৌশল বা কাজ তৈরি করা। যেমন: একজন ড্যান্সারের বিভিন্ন নাচের মুদ্রা মিলিয়ে নতুন একটি কোরিওগ্রাফি তৈরি করা।

সুতরাং, পরেরবার যখন আপনি পারফেক্ট গোল করে এক কাপ চা বানাবেন, মনে রাখবেন এর পেছনেও কিন্তু আপনার মনোপেশিজ ক্ষেত্রের অবদান রয়েছে!

শেষ কথা

আশা করি, শিখনের এই তিনটি ক্ষেত্র নিয়ে আপনার ধারণা এখন অনেকটাই পরিষ্কার। বেঞ্জামিন ব্লুমের এই তত্ত্ব আমাদের এটাই বোঝায় যে, পরিপূর্ণভাবে শিখতে হলে আমাদের মস্তিষ্ক, হৃদয় এবং শরীর তিনটিকেই সমানভাবে কাজে লাগাতে হয়। শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই হবে না, সেই জ্ঞানের সাথে আবেগ ও মানবিক মূল্যবোধকে জুড়তে হবে এবং তাকে বাস্তবে প্রয়োগ করার দক্ষতাও অর্জন করতে হবে।

এখন আপনার পালা! কমেন্টে আমাদের জানান, আজকের এই আলোচনা থেকে নতুন কী শিখলেন? অথবা আপনার জীবনে এই তিনটি ক্ষেত্রের কোনো মজার উদাহরণ থাকলে সেটাও শেয়ার করতে পারেন। চলুন, আমাদের শেখার এই যাত্রাকে আরও আনন্দময় করে তুলি!

Leave A Reply